পরীক্ষার সময় তথ্য মনে রাখা অনেক ছাত্র-ছাত্রীর জন্যই একটা বড় সমস্যা। পড়তে বসলেও মাথায় কিছু ঢুকছে না, কিংবা পরীক্ষার হলে বসে সব ভুলে যাওয়া এসব কারণে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু জানেন কি, কিছু সহজ কৌশল ব্যবহার করে স্মৃতিশক্তি বাড়ানো সম্ভব? গবেষণায় দেখা গেছে, Active Recall, Mind Mapping, আর Chunking-এর মতো পদ্ধতি মস্তিষ্ককে আরও শক্তিশালী করে এবং তথ্য মনে রাখতে সাহায্য করে। আজ আমরা এমন ৬টি কার্যকর কৌশল নিয়ে কথা বলব, যা আপনার পড়াশোনা আর পরীক্ষার প্রস্তুতিকে সহজ করে তুলবে। চলুন, একটু বিস্তারিত জেনে নিই।
স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করার উপায়
চাঙ্কিং (Chunking)
পড়তে বসে মনে হয় বইয়ের পাতা যেন শেষই হচ্ছে না? এই সমস্যার সমাধান হলো Chunking। এই পদ্ধতিতে বড় তথ্যকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে ফেলতে হয়। ধরুন, আপনি ইতিহাস পড়ছেন। একসঙ্গে সব ঘটনা মনে রাখার চেষ্টা না করে, সেগুলোকে সময় বা গুরুত্ব অনুযায়ী ভাগ করুন। যেমন—১৯৪৭ সালের ঘটনা এক ভাগে, ১৯৭১ সালের ঘটনা আরেক ভাগে। এভাবে ভাগ করলে মাথায় তথ্য গুছিয়ে বসে, আর পরীক্ষার সময় দ্রুত মনে পড়ে। এটি মস্তিষ্কের জন্যও আরামদায়ক, কারণ ছোট ছোট অংশ মনে রাখা অনেক সহজ। তাই পরের বার পড়ার সময় বইটা হাতে নিয়ে একটু ভাগ করে দেখুন, ফল পাবেন।
ভিজুয়ালাইজেশন (Visualisation)
আপনি কি কখনো লক্ষ করেছেন, কোনো সিনেমার দৃশ্য অনেক দিন মনে থাকে? এর কারণ হলো ছবি আমাদের মাথায় বেশি প্রভাব ফেলে। Visualisation হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে পড়া বিষয়ের সঙ্গে মানসিক ছবি তৈরি করতে হয়। ধরুন, আপনি জীববিজ্ঞানে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পড়ছেন। শুধু বইয়ের লেখা পড়ে মুখস্থ করার বদলে, চোখ বন্ধ করে একটা রঙিন ছবি কল্পনা করুন—যেমন হৃৎপিণ্ড কীভাবে রক্ত পাম্প করে। ছবিটা যত মজার বা অদ্ভুত হবে, তত সহজে মনে থাকবে। আমার এক বন্ধু এভাবে পড়ে পরীক্ষায় পুরো প্রশ্নের উত্তর ছবি এঁকে বোঝাতো! তাই একটু কল্পনার রং ছড়িয়ে দেখুন, স্মৃতিশক্তি বাড়বে।
ম্নোমনিক্স (Mnemonics)
কিছু জিনিস মনে রাখা যেন মাথা ফাটানোর মতো কঠিন হয়ে যায়। তবে Mnemonics ব্যবহার করলে এই কঠিন কাজ সহজ হয়ে যায়। এটি হলো এমন একটি উপায়, যেখানে শব্দ বা বাক্য বানিয়ে তথ্য মনে রাখা হয়। উদাহরণ দিই—রংধনুর সাতটা রং মনে রাখতে আমরা “ROYGBIV” বলি, যার মানে লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, ইন্ডিগো, বেগুনি। এভাবে একটা লম্বা তালিকাও মনে রাখা যায়। আমি নিজেও স্কুলে পড়ার সময় গ্রহের নাম মনে রাখতে “মঙ্গলে শুক্রে বুধ” বলে একটা বাক্য বানিয়েছিলাম। আপনিও চেষ্টা করে দেখুন, কঠিন জিনিস সহজ লাগবে।
লোকি পদ্ধতি (Method of Loci)
এই কৌশলটা একটু পুরোনো, কিন্তু দারুণ কাজের। Method of Loci বলে যেটা, সেটা হলো একটা পরিচিত জায়গার সঙ্গে তথ্য জুড়ে দেওয়া। ধরুন, আপনার বাসার কথা মনে করুন। এখন কল্পনা করুন, দরজায় ঢুকতেই ১৯৪৭ সালের একটা ঘটনা আছে, সোফায় বসে ১৯৭১ সালের আরেকটা ঘটনা। পরীক্ষার সময় শুধু মনে মনে বাসায় হেঁটে বেড়ালেই তথ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠবে। আমি একবার এভাবে ভূগোলের নদীর নাম মনে রেখেছিলাম—প্রতিটি নদীকে বাসার একেকটা ঘরে বসিয়ে দিয়েছিলাম। আপনার পরিচিত কোনো জায়গা বেছে নিয়ে এটা করে দেখুন, মজাও পাবেন, কাজও হবে।
মাইন্ড ম্যাপিং (Mind Mapping)
পড়ার সময় তথ্য এলোমেলো হয়ে গেলে মনে রাখা কঠিন। এই সমস্যা দূর করতে Mind Mapping দারুণ একটা উপায়। এটি হলো একটা কাগজে মূল বিষয়টা মাঝে লিখে তার চারপাশে শাখা বের করে সম্পর্কিত তথ্য যোগ করা। ধরুন, আপনি “পরিবেশ দূষণ” পড়ছেন। মাঝে লিখুন “পরিবেশ দূষণ”, তারপর শাখা বের করে লিখুন—বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, শব্দ দূষণ। প্রতিটি শাখায় আরও ছোট ছোট তথ্য যোগ করুন। এভাবে পড়লে সবকিছু গোছানো থাকে, আর পরীক্ষায় দ্রুত মনে পড়ে। আমি নিজে এটা ব্যবহার করে দেখেছি এক পলকে পুরো অধ্যায়টা মাথায় চলে আসে। আপনিও একবার চেষ্টা করে দেখুন।
পুনরায় স্মরণ (Practice Recall)
শুধু পড়ে গেলেই হবে না, মনে রাখতে হলে Practice Recall করতে হবে। এর মানে হলো, নোট না দেখে নিজে নিজে তথ্য মনে করার চেষ্টা করা। ধরুন, একটা অধ্যায় পড়া শেষ করলেন। এবার বই বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করুন—এখানে কী ছিল? কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে? এভাবে বারবার চেষ্টা করলে স্মৃতি শক্তিশালী হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, Active Recall মস্তিষ্কের স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়। আমি পরীক্ষার আগে এভাবে নিজেকে পরীক্ষা করতাম, আর দেখতাম পরীক্ষার হলে উত্তর লিখতে গিয়ে সব মনে পড়ে যাচ্ছে। তাই পড়ার পর একটু সময় নিয়ে এটা করে দেখুন।
কৌশলগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই ৬টি কৌশল শুধু পড়াশোনাকে সহজ করে না, আপনার স্মৃতিশক্তি আর আত্মবিশ্বাসও বাড়ায়। পরীক্ষার সময় মাথা ঠান্ডা রেখে তথ্য মনে আনতে পারলে ফলাফলও ভালো হয়। গবেষণা বলছে, যারা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে, তারা অন্যদের তুলনায় বেশি সফল হয়। তাই শুধু বইয়ের পেছনে সময় না দিয়ে এই কৌশলগুলো একটু আয়ত্ত করে নিন।
পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া কোনো কঠিন কাজ নয়, যদি সঠিক উপায় জানা থাকে। Chunking, Visualisation, Mnemonics, Method of Loci, Mind Mapping, আর Practice Recall এই ৬টি কৌশল আপনার পড়াশোনাকে আরও মজার আর কার্যকর করে তুলবে। আমি নিজেও এগুলো ব্যবহার করে দেখেছি, আর ফল পেয়েছি। আপনিও একটু চেষ্টা করে দেখুন, দেখবেন পরীক্ষার হলে বসে আর ভয় লাগছে না বরং সব তথ্য হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এওরকম তথ্য আরও পড়তে শিক্ষা নিউজের এই ক্যাটাগরি ঘুরে পড়তে পারেন।