প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আমরা সবাই জানি, ঈদ মানে আনন্দ, উৎসব আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। কিন্তু এই আনন্দের মাঝে যদি হঠাৎ বেতন না পাওয়ার চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকে, তাহলে কেমন লাগে? বাংলাদেশের সাড়ে তিন লাখের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এখন এমনই এক দুঃখজনক পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তাদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এই উদ্যোগ কি সত্যিই তাদের সমস্যার সমাধান করবে, নাকি এটি শুধুই একটি লোকদেখানো প্রচেষ্টা? আসুন, বিষয়টি একটু খোলাসা করে দেখি।
এমপিও শিক্ষকদের বেতনের খবর ২৯ এপ্রিল ২০২৫ ছাড়
আজ শুক্রবার, ২৮ মার্চ ২০২৫। সাধারণত এই দিনটি সরকারি ছুটির দিন। কিন্তু এমপিও শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার জন্য চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী—সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। এই দুই ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষকরা তাদের বেতন তুলতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল, ২৭ মার্চ, একটি সার্কুলার জারি করে এই নির্দেশনা দিয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকের অফিস কার্যক্রম দুপুর ৩টা পর্যন্ত চলবে। তবে দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত জুমাতুল বিদার নামাজের জন্য বিরতি থাকবে।
এই ব্যবস্থার পেছনে সরকারের যুক্তি হলো, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী জনস্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যারা এই দিন কাজ করবেন, তারা নিয়ম অনুযায়ী ভাতাও পাবেন। সরকার বলছে, ঈদের আগে শিক্ষকদের বেতন নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু শিক্ষকরা এটাকে নিষ্ঠুর সান্ত্বনা বলে অভিহিত করছেন। কেন? কারণ দুই ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত সময়ে অনেকেই বেতন তুলতে পারবেন না বলে অভিযোগ তুলেছেন।
শিক্ষকদের কষ্টের চিত্র
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য এই বেতন সংকট নতুন কিছু নয়। অনেকে গত ডিসেম্বর থেকে বেতন পাননি। সরকারি শিক্ষকরা যখন মার্চ মাসের বেতন আর উৎসব ভাতা পেয়ে ঈদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন এমপিও শিক্ষকরা অপেক্ষায় দিন গুনছেন। ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) নামের একটি জটিল প্রক্রিয়ার কথা বলে তাদের বেতন আটকে রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
দৈনিক শিক্ষাডটকমের একটি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা এই সংকটের জন্য দায়ী। উপপরিচালকরা ব্যস্ত বদলি বাণিজ্যে, ইএমআইএসের জামিল ও জহির ব্যস্ত ঘুষ নেওয়ায়, আর বাকিরা অহেতুক সেমিনার ও মিটিংয়ে সময় কাটাচ্ছেন। এদিকে শিক্ষকরা অবহেলা আর অদক্ষতার শিকার হয়ে দিনের পর দিন কষ্ট পাচ্ছেন।
বিষয় | বিস্তারিত |
---|---|
এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী | সাড়ে তিন লাখের বেশি |
বেতন আটকে থাকা | ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে অনেকের |
ব্যাংক খোলার সময় | ২৮ মার্চ, সকাল ১০টা-দুপুর ১২টা |
উৎসব ভাতা পাওয়া | সরকারি শিক্ষকরা পেয়েছেন, এমপিওরা পাননি |
অভিযোগ | অবহেলা, অদক্ষতা, ঘুষ, বদলি বাণিজ্য |
এই টেবিল থেকে স্পষ্ট, এমপিও শিক্ষকদের সঙ্গে কতটা বৈষম্য হচ্ছে। যেখানে সরকারি শিক্ষকরা সময়মতো টাকা পাচ্ছেন, সেখানে এমপিও শিক্ষকদের জন্য শেষ মুহূর্তে এসে দুই ঘণ্টার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ
শিক্ষকদের তীব্র ক্ষোভের মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়ে এই বিশেষ ব্যবস্থার জন্য অনুরোধ করেছে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন বিতরণ করা হয়। তাই এই ব্যাংকগুলো একদিন খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত কয়েক মাস ধরে এই সমস্যা চলছে, তাহলে আগে কেন কিছু করা হয়নি? শিক্ষকদের অভিযোগ, এতদিন শুধু অবহেলা আর অদক্ষতায় সময় নষ্ট হয়েছে।
একটি মজার বিষয় হলো, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষক-কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে কম সমস্যার মুখে পড়েছেন। তারা অনেকেই ইতিমধ্যে উৎসব ভাতার টাকা তুলতে পেরেছেন। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, এই অধিদপ্তরগুলো প্রশাসন ক্যাডার দ্বারা পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর শিক্ষা ক্যাডার দ্বারা পরিচালিত, যেখানে সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। এই বৈষম্য কেন, তা নিয়ে শিক্ষকদের মনে প্রশ্ন জাগছে।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কিছু জরুরি পদক্ষেপ দরকার। প্রথমত, বেতন বিতরণে ইএফটি প্রক্রিয়ার জটিলতা কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের বেতন সময়মতো দেওয়ার জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ঈদের মতো উৎসবের আগে এমন হযবরল পরিস্থিতি না হয়।
আমার মতামত
একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার মনে হয়, শিক্ষকরা আমাদের সমাজের মেরুদণ্ড। তাদের এভাবে কষ্টে থাকতে দেখলে মন খারাপ হয়। সরকার যদি সত্যিই শিক্ষার উন্নতি চায়, তাহলে শিক্ষকদের প্রতি আরেকটু সদয় হওয়া উচিত। দুই ঘণ্টার ব্যাংক খোলা রাখা একটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে, কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়। শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে আরো বড় পরিকল্পনা দরকার।
ঈদের আগে শিক্ষকদের মুখে হাসি ফোটানোর দায়িত্ব আমাদের সবার। সরকার, ব্যাংক, অধিদপ্তর—সবাই মিলে যদি একটু চেষ্টা করে, তাহলে এই সংকট থেকে বেরোনো সম্ভব। আজকের এই বিশেষ ব্যবস্থা হয়তো কিছু শিক্ষকের মুখে হাসি ফোটাবে, কিন্তু যারা বেতন তুলতে পারবেন না, তাদের কী হবে? তাদের কথাও ভাবা উচিত। আশা করি, আগামী দিনে শিক্ষকদের এমন দুর্দশা আর দেখতে হবে না। সবাই মিলে একটু চেষ্টা করলেই তো ঈদটা সত্যিকারের আনন্দের হতে পারে, তাই না? জাইহোক এমপিও সম্পর্কে ও শিক্ষা সম্পর্কিত তথ্যের সকল প্রকার আপডেট জানার জন্য শিক্ষা নিউজকে অনুসরণ করুন এবং শিক্ষানিউজের ইউটিউব চ্যানেলকে সাবস্ক্রাইব করুন।