এই লেখাটি পড়লে আপনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় টিসি ফরম ও কলেজ ট্রান্সফার নিয়ম ২০২৫ সম্পর্কে জানতে পারবেন। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শিক্ষার্থীদের কলেজ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। অনেক সময় নানা কারণে শিক্ষার্থীদের এক কলেজ থেকে আরেক কলেজে যেতে হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটা এত সহজ নয়। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কলেজ ছাড়পত্র (Transfer Certificate) নিয়ে নতুন কিছু নিয়ম জারি করা হয়েছে। এই নিয়মগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য কীভাবে কাজ করবে, কী কী কাগজপত্র লাগবে, আর কোন কোন শর্ত মানতে হবে এসব নিয়ে আজ আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব। তাই আপনি যদি একজন শিক্ষার্থী বা অভিভাবক হন, তাহলে এই লেখাটি আপনার জন্যই। চলুন, শুরু করা যাক।
কলেজ পরিবর্তনের সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা
নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী যদি স্নাতক প্রথম বর্ষ পাস করে, তাহলে সে এক কলেজ থেকে আরেক কলেজে যাওয়ার জন্য ছাড়পত্রের আবেদন করতে পারবে। তবে এখানে কিছু শর্ত আছে। যেমন, সরকারি কলেজ থেকে সরকারি বা বেসরকারি কলেজে যাওয়া যাবে। আবার বেসরকারি কলেজ থেকে বেসরকারি কলেজে ছাড়পত্র নেওয়া যাবে। কিন্তু বেসরকারি কলেজ থেকে সরকারি কলেজে যাওয়ার জন্য আবেদন করা যাবে না। এই নিয়মটা হয়তো অনেকের কাছে একটু কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে সরকারের পরিকল্পনা আছে। তারা চায় সরকারি কলেজগুলোতে ভর্তির চাপ কম থাকুক।
অভিভাবকের চাকরির কারণে ছাড়পত্র
অনেক সময় দেখা যায়, অভিভাবকের চাকরির জন্য পরিবারকে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যেতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদেরও কলেজ বদল করতে হয়। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, যদি অভিভাবক (পিতা, মাতা বা স্বামী) সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং তিনি অন্য জেলায় বদলি হন, তাহলে শিক্ষার্থী ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করতে পারবে। তবে এর জন্য কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হবে। যেমন:
- বদলির আদেশ
- যোগদানপত্র
- চাকরির আইডি কার্ড
- অভিভাবকের সম্মতিপত্র
এই কাগজগুলো ছাড়া আবেদন গ্রহণ করা হবে না। তাই এসব জোগাড় করে রাখা জরুরি।
মেয়ে শিক্ষার্থীদের বিয়ের কারণে ছাড়পত্র
মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য একটা বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। যদি কোনো মেয়ে স্নাতক সম্মান বা পাস কোর্সে ভর্তির পর বিয়ে করেন, তাহলে তিনি স্বামীর কর্মস্থলের কাছাকাছি কলেজে ছাড়পত্র নিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কিছু কাগজপত্র লাগবে। যেমন:
- বিবাহের কাবিননামা (মুসলিমদের জন্য)
- হিন্দু, খ্রিস্টান বা বৌদ্ধদের ক্ষেত্রে কাবিননামা না থাকলে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান/ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র
- স্বামী-স্ত্রীর যৌথ ছবি
- বিয়ের দাওয়াতপত্র
- স্বামীর চাকরির প্রত্যয়নপত্র, যোগদানপত্র বা জাতীয় পরিচয়পত্র
এই নিয়মটা মেয়েদের জন্য অনেক সুবিধা নিয়ে এসেছে। বিয়ের পর অনেক সময় দূরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে।
স্থায়ী ঠিকানার কাছাকাছি কলেজে যাওয়া
অনেক শিক্ষার্থী চায় তার বাড়ির কাছাকাছি কলেজে পড়তে। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থী যদি তার স্থায়ী ঠিকানার কাছাকাছি কলেজে যেতে চায়, তাহলে সে ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করতে পারবে। তবে যদি তার জেলায় তার পড়া বিষয়টি না থাকে, তাহলে পাশের জেলার কলেজে আবেদন করা যাবে। এর জন্য লাগবে:
- শিক্ষার্থী বা তার পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র
- অভিভাবকের মতামত পত্র
কর্তৃপক্ষ যদি কারণটা যৌক্তিক মনে করে, তাহলে ছাড়পত্র দেওয়া হবে। এটা শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ সুবিধার।
অভিভাবকের মৃত্যুর কারণে ছাড়পত্র
অভিভাবকের মৃত্যু হলে শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক সমস্যা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ছাড়পত্রের আবেদন করা যাবে। তবে এর জন্য কিছু কাগজ লাগবে। যেমন:
- ডাক্তারের দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট বা চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র
- নতুন অভিভাবকের সম্মতিপত্র, তার পেশা ও কর্মস্থলের প্রমাণ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র
এই নিয়মটা পরিবারের কঠিন সময়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্য করবে।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধা
যদি কোনো শিক্ষার্থী প্রতিবন্ধী হয়, তাহলে তাকে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের সনদপত্র জমা দিতে হবে। এটা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করবে।
একই জেলায় কলেজ পরিবর্তন
নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, একই জেলার দুটি কলেজের মধ্যে ছাড়পত্র দেওয়া যাবে না। তবে মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশেষ কারণে এই শর্ত শিথিল করা যাবে। এটা মেয়েদের জন্য আরেকটি সুবিধা।
শতবর্ষী কলেজের বিশেষ নিয়ম
শতবর্ষী কলেজ থেকে সব সরকারি-বেসরকারি কলেজে ছাড়পত্র নেওয়া যাবে। কিন্তু অন্য কোনো কলেজ থেকে শতবর্ষী কলেজে যাওয়া যাবে না। এটা শতবর্ষী কলেজের মর্যাদা রক্ষার জন্য করা হয়েছে।
অধিভুক্তি স্থগিত হলে
যদি কোনো কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম বা বিষয়ের অধিভুক্তি স্থগিত হয়, তাহলে শিক্ষার্থী ছাড়পত্র নিতে পারবে। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শন দপ্তরের চিঠি জমা দিতে হবে।
আবেদনের সাথে কী কী জমা দিতে হবে?
ছাড়পত্রের আবেদনের সাথে কিছু জরুরি কাগজ জমা দিতে হবে। যেমন:
- রেজিস্ট্রেশন কার্ড
- প্রবেশপত্র
- পরীক্ষার ফলাফল
- পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র
এগুলো ছাড়া আবেদন গ্রহণ করা হবে না।
আবেদনের সময়সীমা
শিক্ষার্থীকে ফলাফল প্রকাশের ৪৫ দিনের মধ্যে অনলাইনে আবেদন করতে হবে। আর একজন শিক্ষার্থী একাধিকবার ছাড়পত্র নিতে পারবে না। তাই সিদ্ধান্ত ভালোভাবে নিতে হবে।
কলেজ ছাড়পত্র নিয়ে এই নতুন নিয়মগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক সুযোগ এনেছে, আবার কিছু শর্তও আরোপ করেছে। আমার মনে হয়, এই নিয়মগুলো ভালোভাবে বুঝে কাজ করলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পথ আরও সহজ হবে। আপনি যদি এই প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকেন, তাহলে কাগজপত্র ঠিকঠাক রাখুন আর সময়মতো আবেদন করুন। কোনো সমস্যা হলে কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমাধান করুন। অন্যান্য শিক্ষা বিষয়ক তথ্য সবার আগে জানতে শিক্ষা নিউজের এই ক্যাটাগরি ঘুরে দেখুন।