বেসরকারি স্কুল-কলেজে কাজ করা এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সুখবর এসেছে। ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন আর ঈদুল ফিতরের বোনাসের জন্য সরকারি আদেশ বা জিও (Government Order) জারি হয়েছে। এই খবর শিক্ষক-কর্মচারীদের মনে একটু হলেও স্বস্তি এনেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ইএমআইএস) সেলের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট খন্দকার আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহের শেষ দিন, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ), শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের বেতন ও বোনাসের টাকা পেতে পারেন। এই খবরটি শুনে অনেকেই আশা করছেন যে, এবার ঈদের আগে তাদের হাতে কিছু টাকা থাকবে, যা দিয়ে পরিবারের জন্য কেনাকাটা বা অন্যান্য খরচ চালানো যাবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও ঈদ বোনাস ২০২৫ কি দিবে
খন্দকার আজিজুর রহমান আরও বলেছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জিও জারি হলেও টাকা হাতে পাওয়ার আগে আরও কয়েকটি ধাপ পার করতে হয়। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো আইবাস (iBAS) সিস্টেম থেকে তথ্য পাঠানো। কিন্তু এখানে কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা (Technical Issues) দেখা দিয়েছে। তিনি জানান, এই সমস্যা সমাধানের জন্য তারা দ্রুত কাজ করছেন। যদি আজ (মঙ্গলবার, ২৫ মার্চ) এই কাজ শেষ করা যায়, তাহলে বৃহস্পতিবারের মধ্যে শিক্ষক-কর্মচারীদের হাতে ফেব্রুয়ারির বেতন আর ঈদের উৎসব ভাতা (Festival Allowance) চলে আসবে। এই খবরটি শিক্ষকদের জন্য একটি বড় আশার কথা। কারণ, বেতন আর বোনাস সময়মতো না পেলে তাদের সংসার চালানো অনেক কষ্টের হয়ে যায়।
আগে কীভাবে বেতন-ভাতা দেওয়া হতো
আমরা জানি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের বেতন-ভাতা ইএফটি (Electronic Fund Transfer)-এর মাধ্যমে পান। এটি একটি আধুনিক পদ্ধতি, যেখানে টাকা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে আসে। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করা এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে আগে এমন সুবিধা ছিল না। তাদের বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগার থেকে ছাড় হলেও, তা রাষ্ট্রায়ত্ত ৮টি ব্যাংকের মাধ্যমে অ্যানালগ পদ্ধতি (Analog Method)-তে দেওয়া হতো। এই পদ্ধতিতে শিক্ষকদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো। ব্যাংকে লাইনে দাঁড়াতে হতো, কাগজপত্র জমা দিতে হতো, আর অনেক সময় টাকা তুলতে দেরি হয়ে যেত। এতে তাদের সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়ত।
শিক্ষকদের এই ভোগান্তি দূর করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত বছর একটি বড় সিদ্ধান্ত নেয়। ৫ অক্টোবর, ২০২৪, বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তারা ঘোষণা দেয় যে, বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এখন থেকে ইএফটি-তে দেওয়া হবে। এই ঘোষণার পর প্রাথমিকভাবে ২০৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অক্টোবর মাসের বেতন ইএফটি-তে ছাড়া হয়। এটি ছিল একটি পরীক্ষামূলক ধাপ। তারপর ধীরে ধীরে এই সংখ্যা বাড়তে থাকে।
- ১ জানুয়ারি, ২০২৫: প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার শিক্ষক ইএফটি-র মাধ্যমে বেতন-ভাতা পান।
- দ্বিতীয় ধাপ: ৬৭ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী ডিসেম্বরের বেতন পান।
- তৃতীয় ধাপ: ৮৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী বেতন পান।
- চতুর্থ ধাপ: ৮ হাজার ২০০-এর বেশি শিক্ষক-কর্মচারী ডিসেম্বরের বেতন পান।
এছাড়া, জানুয়ারি মাসের বেতনও তারা ইএফটি-র মাধ্যমে পেয়েছেন। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন এখনও বাকি আছে, যা এখন ছাড়ার প্রক্রিয়া চলছে। এই নতুন পদ্ধতি শিক্ষকদের জন্য অনেক সুবিধা নিয়ে এসেছে। তারা এখন আর ব্যাংকে লাইনে দাঁড়াতে হয় না, টাকা সরাসরি তাদের অ্যাকাউন্টে চলে আসে। এতে সময় বাঁচে, আর সংসার চালানোর জন্য টাকা দ্রুত হাতে পাওয়া যায়।
বেতন-বোনাসের পরিমাণ কত
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও বোনাসের পরিমাণ নির্ভর করে তাদের পদ ও অভিজ্ঞতার ওপর। তবে সাধারণত ঈদের বোনাস হিসেবে একটি মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ টাকা দেওয়া হয়।
পদ | মূল বেতন (প্রতি মাস) | ঈদ বোনাস (আনুমানিক) |
---|---|---|
প্রধান শিক্ষক | ৩৫,০০০ টাকা | ৩৫,০০০ টাকা |
সহকারী শিক্ষক | ২৫,০০০ টাকা | ২৫,০০০ টাকা |
অফিস সহকারী | ১৫,০০০ টাকা | ১৫,০০০ টাকা |
(দ্রষ্টব্য: এটি একটি আনুমানিক হিসাব। প্রকৃত পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।)
এই টাকা শিক্ষকদের জন্য ঈদের সময় একটি বড় সাহায্য। কারণ, ঈদ মানে শুধু আনন্দ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের জন্য কেনাকাটা, খাবারের আয়োজন আর অন্যান্য খরচ। তাই বেতন আর বোনাস সময়মতো পাওয়া তাদের জন্য খুবই জরুরি।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করা শিক্ষকদের জীবন অনেক সময় চ্যালেঞ্জিং। তাদের বেতন সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় কম, আর সময়মতো বেতন না পেলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ইএফটি পদ্ধতি চালু হওয়ার পর তাদের জীবনে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এখন তারা বেতনের জন্য ব্যাংকে দৌড়াদৌড়ি করতে হয় না। টাকা সরাসরি অ্যাকাউন্টে আসে, যা তাদের সময় আর শ্রম বাঁচায়। এছাড়া, ঈদের মতো উৎসবের সময় বোনাস পাওয়া তাদের মুখে হাসি ফোটায়।
ইএফটি পদ্ধতি চালু হলেও সবকিছু এখনও পুরোপুরি ঠিকঠাক চলছে না। যেমন, এবার ফেব্রুয়ারির বেতন ও বোনাস ছাড়তে দেরি হয়েছে। আইবাস সিস্টেমে টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে এই দেরি হচ্ছে। এছাড়া, সব শিক্ষক-কর্মচারী এখনও এই সুবিধার আওতায় আসেনি। অনেকে হয়তো এখনও পুরোনো পদ্ধতিতে বেতন পাচ্ছেন। তাই সরকারের উচিত এই সিস্টেমকে আরও মজবুত করা, যাতে কোনো শিক্ষকই বঞ্চিত না হন।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য ফেব্রুয়ারির বেতন ও ঈদ বোনাসের জিও জারি একটি সুখবর। এটি তাদের জীবনে একটু হলেও স্বস্তি আনবে। ইএফটি পদ্ধতি চালু হওয়ায় তাদের ভোগান্তি অনেক কমেছে, তবে এই সিস্টেমকে আরও উন্নত করার সুযোগ আছে। আশা করি, আগামী দিনে শিক্ষকরা তাদের বেতন-ভাতা সময়মতো পাবেন, আর ঈদের আনন্দটা তাদের জন্য আরও পূর্ণ হবে। এই ধরনের তথ্য শিক্ষা নিউজে পেতে নিয়মিত ফলো করুন।